পশ্চিমবঙ্গে CPM কি উঠে যেতে চলেছে?

Total Reads: 31

পশ্চিমবঙ্গে CPM কি উঠে যেতে চলেছে? এটা এখন একটি খুব স্বাভাবিক প্রশ্ন। দল হিসেবে হয়তো উঠবে না, কারণ কিছু মেম্বার যখন রয়েছে, তাছাড়া কিছু অফিস যখন রয়েছে। কিন্তু রাজনৈতিক রঙ্গমঞ্চে CPM এর অস্তিত্ব হয়তো আর থাকবে না।

এরকম একটা ভাবনার কারণ কি? এই বিষয়টি বুঝতে হলে বিগত কিছু নির্বাচনের ফলাফল পর্যালোচনা করতে হবে। শুরু করা যাক 2011 থেকে। 2011 তে CPM 30% ভোট পেয়ে 40 টি আসন পেয়েছিল। সহযোগী দল FB 4.8% ভোট পেয়ে 11 টি আসন পেয়েছিল। RSP 3% ভোট পেয়ে 3 টি আসন পেয়েছিল।

2011 তে TMC 39% ভোট পেয়ে 184 টি আসন পেয়েছিল। আর INC 9%  ভোট পেয়ে 42 টি আসন পেয়েছিল। BJP ছিল 0

এর পরের 2016 তে বিধানসভা নির্বাচনের ফলাফল দেখা যাক। CPM 20% ভোট পেয়ে 26 টি আসন পেয়েছিল। TMC 45.6 % ভোট পেয়ে 211 টি আসন পেয়েছিল। বিজেপি 10% ভোট পেয়ে 3 টি আসন পেয়েছিল। INC 12% ভোট পেয়ে 44 টি আসন পেয়েছিল।

2016 তে একটি নতুন বিষয় ছিল। সেবারে বাম তার চির শত্রু  কংগ্রেসের সাথে মহাজোট করেছিল। এর ফলে CPM এর একটি বড় ভোট CPM থেকে বেড়িয়ে যায়। এমনকি বহু ভোটার ভোট দেন নাই। 2011-2016 তে CPM এর প্রাপ্ত ভোট 10% নেমে আসে। লক্ষনীয় বিষয় হলো INC 3% ভোট বাড়িয়ে 2 টি অতিরিক্ত আসন লাভ করে। INC এর অতিরিক্ত আসন অবশ্যই CPM এর ভোট ব্যাঙ্ক থেকে আগত।

আরো একটি বিষয় লক্ষণীয় যে TMC এর ভোট 6% এর বেশি বৃদ্ধি পায়। এই 6% ভোট অবশ্যই কংগ্রেসের ভোট। যারা বাম কংগ্রেস জোটের কারণে বিক্ষুব্ধ হয়েছিল। তাহলে তো INC র ভোট 6% কমার কথা। সেখানে INC  কিভাবে 12% ভোট পেল। এর জন্য আমাদের 2011 এর বিধানসভা নির্বাচনের ফলাফল এর দিকে তাকাতে হবে।

2011 তে CPM কিন্তু খুব খারাপ জায়গায় ছিল না। 30% ভোট পেয়েছিল, সাথে প্রায় 71 টি সিটে জয় পরাজয়ের ব্যবধান ছিল 75-250-500 ভোটের। সুতরাং তাদের থেকে পাওয়া ভোটে যে INC 12% ভোট পেয়েছিল সেটা সহজেই অনুমেয়। কিন্তু তাহলে কংগ্রেস ভোটে বামের লাভ হলো না কেন?

এর উত্তর খুব‌ই সহজ, যদি 2011 বা তার আগের বিধানসভা নির্বাচনের ফলাফল বিশ্লেষণ করা যায় তাহলে দেখা যাবে মধ্য বঙ্গে কতকগুলো আসন বাদ দিয়ে INC তৃতীয় বা কোথাও চতুর্থ শক্তি। সুতরাং সেই ভোটের একটি অংশ CPM এ যদি এসেও থাকে তাহলেও তার কোন সুফল দেখতে পাওয়া এক প্রকার অসম্ভব। 2016 তে একটি নতুন ঘটনা ঘটেছিল আর সেটা ছিল BJP এর উত্থান। BJP প্রায় 7% ভোট বাড়িয়ে 3 টি আসন লাভ করে। 2011 তে বামফ্রন্ট এর হারের পর নতুন কিছু ঘটেনি যে বাম ভোট কমতে পারে। এর পুরোটাই হয়েছিল চিরশত্রু কংগ্রেসের সাথে আঁতাতের ফলে। এই 7% ভোট যেটা BJP এর দিকে চলে গিয়েছিল সেটা অবশ্যই বাম ভোট। তখন TMC বিভিন্ন জায়গায় বাম বিশেষতঃ CPM পার্টি মেম্বার ও সাপোর্টারদের উপর নিষ্পেষণ চালাচ্ছিল। তখন CPM নেতৃত্ব নিজেদের রক্ষার তাগিদে সাপোর্টারদের রক্ষা করার পরিবর্তে প্রকাশ্যে ঘোষণা করে BJP এর শরনে যাওয়ার কথা বলে।

2021 আবার সেই মহাজোট এবং ফলাফল শুন্য। TMC 48% ভোট পেয়ে 213 আসন পেয়েছিল। আর BJP 38.5% ভোট পেয়ে 77 টি আসন পেয়েছিল। কংগ্রেস এর 3% ভোট TMC তে চলে যায়। ফলে TMC ভোট 48% হয়ে যায়। আর BJP এর 35% ভোটের পুরোটাই বাম ভোট, কারণ 2021 CPM ভোট 5% এর নীচে চলে যায়। ধরা যেতে পারে 2011 এর হিসেবে 25% CPM ভোট, আর 10% বাম জোটের সহযোগী দলের ভোট, মোট 35%

CPM এর ভোটের পরিমাপ ঠিক কতো? 2001 এর হিসেবে 36% 2006 কে ধরছি না কারণ 2006 তে CPM একটি অবাঙ্গালী ভোট পেয়েছিল একজন পার্টি সমর্থকের সৌজন্যে। নয়তো 2006 তেই ভরাডুবির আশঙ্কা ছিল। যেটাকে পার্টির নেতৃত্ব স্বীকার না করে বুদ্ধবাবুর ক্যারিশমা বলে চালিয়ে দেয়। কার্যত বুদ্ধবাবুর কোন ক্যারিশমা কোনদিন‌ই ছিল না, যারা বুদ্ধবাবুকে চিনতেন তারা জানতেন। বুদ্ধবাবু নেপোটিজেমের লবির জোরে জ্যোতি বসু কে অপসারণ করে মুখ্যমন্ত্রী হয়েছিলেন। অনেকে এটা মানতে চাইবেন না। কিন্তু ইতিহাস তো মিথ্যে কথা বলে না। তার এমন ক্যারিশমা ছিল যে 2011 তে নিজের আসনেই জয়ী হতে পারেননি। কিন্তু ঐ বছরের বিধানসভায় CPM অনেক প্রতিকূলতার মধ্যেও শূন্য হয়ে যায়নি। CPM নেতৃত্ব এতোটাই দাম্ভিক যে কারোর সহায়তা নিলে তার কৃতিত্ব স্বীকার করতে হয় এই বিষয়টিকে গ্ৰাহ্য করে না। আর সহযোগী দলের ভোট 12% মোট। 2011 তে বামের যে ভাসমান ভোট বা সুবিধাবাদী ভোট ছিল সেই ভোট তৃণমূলের দিকে সরে যায়।


2026 এ কংগ্রেস আলাদা লড়বে এখনো পর্যন্ত। আর CPM এর নেতৃত্ব এখন আর আগের মতো স্ট্রং নয় ফলে হাতড়ে বেড়াচ্ছে। কোন দিন‌ই এরা সাধারণ কর্মী বা সাপোর্টারদের কথা শুনতো না। সব সময় চাপিয়ে দেয়া সাথে নেপোটিজম। ক্ষমতার শেষের 15 বছর তলার দিকের নেতৃত্বের অবাধে লুটতরাজে এরা চোখ বন্ধ রেখেছিল। দায়সারা ভাবে পার্টি থেকে বহিস্কার করে ক্ষান্ত থেকেছে। চোর গুলোর উপর কোন আইনি প্রক্রিয়া চালায়নি। বা তাদের লুটের টাকা উদ্ধারের চেষ্টা করেনি। এরকম কয়েক শত চোর রয়েছে যারা বাম জামানায় পার্টির মেম্বার ছিল এবং শুন্য থেকে কোটি কোটি টাকা বানিয়েছে। তাদের কারনে বিভিন্ন শক্তিশালী এলাকায় CPM মাথা তুলতে পারছে না। CPM এর সামনে যে চ্যালেঞ্জ গুলো রয়েছে সেগুলো হলো ভাসমান ভোটারদের ফেরত আনা। বিজেপি তে চলে যাওয়া ভোটারদের ফেরত আনা। এবং বিনা আঁতাতে লড়াই করা।

তবুও SIR এর পরবর্তী পর্যায়ে CPM এর কিছু ভোট BJP তে মোহভঙ্গের কারণে ফিরে আসতে পারে। কিন্তু সেই ভোট CPM নেতৃত্ব কে ভরসা করতে পারছে না, কারণ যদি আবার কংগ্রেসের সাথে আঁতাত গড়ে ওঠে। এছাড়া বিভিন্ন মৌলবাদী দল CPM কে চিৎপটাং করার জন্য চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। অবশ্যই কারোর প্ররোচনায়, কারণ রাজনীতিতে এমনি এমনি কিছু হয় না। এছাড়া সহযোগী দল CPM এর ভরাডুবির একটি বড় কারণ এ বিষয়ে নতুন করে কিছু বলার নেই।

এখন কিছু কিছু জায়গায় CPM কিছু বড়ো বড়ো মিটিং করেছে। কিন্তু সেই ভোট কাদের? 5% CPM ভোটের কিছু স্ট্রংহোল্ড রয়েছে যেখানে ভিড় হয় বা ব্রিগেডে এরা এসে ভিড় করে। এছাড়া প্রোপাগান্ডা পলিটিক্স বলে একটি বিষয় আছে। সেটা হলো ভিড় তৈরি করা, এতে ভোটারদের একটা মেসেজ দেয়া যায়। সমস্ত রাজনৈতিক দল এই প্রয়াস করে থাকে। কিন্তু এভাবে নির্বাচনে কোন দাগ কাটা সম্ভব নয়। আঞ্চলিক মানুষের ভিড় বাড়ছে না তার একটি বড় কারণ হলো তলার দিকের সেই চোর গুলোর কর্ম কান্ড। পার্টির ঐ চোর গুলোর বিচারের দাবি তোলা উচিত, শুধু তৃণমূলের চোরদের নয় সাথে বাম জামানার চোর গুলোর শাস্তির দাবি তুলতে হবে। নয়তো ভিড় হবে কিন্তু ভাড় ভর্তি হবে না।

CPM নেতৃত্বের বিষয়টি ভেবে দেখা উচিত। তবে এইভাবে চললে 2026 পরবর্তী পর্যায়ে CPM 4 টি লোকের দলে পরিণত হবে এ বিষয়ে কোন সন্দেহ থাকতে পারে না।

About The Author


Discover more from Metro Talks

Subscribe to get the latest posts sent to your email.

Leave a Reply